মেয়ে হারাব জানলে ভোট দিতাম না’ বাবার কাঁধে কবরস্থানে চিরঘুমে আশা

সুরাইয়ার বাবা প্রতিবেদককে বলেন, ‘গুলির শব্দে আমিসহ আরও অনেকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করি। মার্কেটের গলির সামনে আমার স্ত্রীর কাছে এসে দেখি আমার মেয়ের মাথার খুলি গুলিতে উড়ে গেছে। আমি সেখানেই অচেতন হয়ে পড়ি।’ ছোট্ট আশা ছিল বাড়ির মধ্যমণি। শিশুটি দুরন্তপনায় ঘর মাতিয়ে রাখত। বড় দুই ভাইবোনের কাছে ছিল খেলার জীবন্ত পুতুল। মা-বাবার ভাঙাচোরা ঘরের আলো ছিল সে।

ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলের বাচোর ইউনিয়নের ফেরিওয়ালা মো. বাদশা ও মিনারা আক্তারের ছোট মেয়ে সুরাইয়া আক্তার আশা। বুধবার দুপুরেও খেলেছে ঘরে-আঙিনায়। বৃহস্পতিবার সে ঘরে ফিরল নিথর আশা। তার প্রাণ গেছে মায়ের কোলেই। সন্তানের মাথার খুলি উড়ে যাওয়ার মতো বীভৎস দৃশ্য বুধবার বিকেলে দেখতে হয়েছে মিনারা ও বাদশাকে।

আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষে ছোট্ট আশার মরদেহ বৃহস্পতিবার হস্তান্তর করেছে পুলিশ। বাবার কাঁধে চড়ে নিজ গ্রাম মীরডাঙ্গী দিঘিরপাড়ে স্থানীয় কবরস্থানে চিরঘুম দিয়েছে আশা।

বাচোর ইউনিয়নে বুধবার ছিল ইউপির ভোট। বিকেলে ভাংবাড়ি ভিএফ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ফল ঘোষণার পর মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি করে পুলিশ। সে সময় কেন্দ্রের পাশে ভাংবাড়ি বেল মার্কেটের সামনে আশাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মিনারা। শিশুসন্তানের বীভৎস মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে আর্তনাদ করছিলেন মিনারা বেগম।

তিনি বলেন, ‘ঘরের কাজ সেরে শেষ সময়ে ভোট দিতে কেন্দ্রে যাই। আমার সঙ্গে আমার স্বামীও গিয়েছিলেন। দুজনে ভোট দিয়েছি। ভোট দিয়ে আমি কেন্দ্রের বাইরে বেল মার্কেটের একটি গলিতে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সে সময় গেটের সামনে পুলিশের সঙ্গে গণ্ডগোল শুরু হয় লোকজনের। সবাই ছুটোছুটি করছিল, গুলির আওয়াজ শুনছিলাম। আমি বাচ্চা নিয়ে মার্কেটের গলিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম ভয়ে। আমার কোলের বাচ্চার মাথার খুলি গুলিতে উড়ে যায়।’ চিৎকার করে মিনারা বলতে থাকেন, ‘আমার মেয়েকে হারাতে হবে জানলে ভোট দিতে যেতাম না। আমি এর বিচার চাই।’

আশার বাবা বলেন, ‘ভোট দিয়ে কেন্দ্রের বাইরে কয়েকজন পরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। কিছুক্ষণ পর ফল ঘোষণা হয়। গেটের সামনে লোকজন পুলিশকে ইট-পাটকেল মারতে থাকে। পুলিশ দেখলাম তাদের পেটাচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে পুলিশ গুলি করে। গুলির শব্দে আমিসহ আরও অনেকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করি। মার্কেটের গলির সামনে আমার স্ত্রীর কাছে এসে দেখি আমার মেয়ের মাথার খুলি গুলিতে উড়ে গেছে। আমি সেখানেই অচেতন হয়ে পড়ি। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই, আমার মেয়ে হত্যার অপরাধীদের বিচার চাই।’